Banglakotha Home   |   Contact Us   |   Current Issue   |
 

সম্পাদকীয়

প্রধান রচনা

কবিতা

বিশেষ রচনা

বিশেষ নিবন্ধ

নিবন্ধ

বিজ্ঞান

সাম্প্রতিক

কিচির-মিচির


১৪৯২ থেকে ২০১৭: স্পেন থেকে আরাকান : সেই একই ট্র্যাজেডি
প্রকাশিত হয়েছে: 'জানুয়ারী ২০১৬' সংখ্যায়
বিষয়: প্রধান রচনা
৭১১ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকার মুসলিম অধিপতি মুসার নির্দেশে সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ স্পেনের নিপীড়িত জনগণের সাহায্যার্থে জাবালুত তারিকে দাঁড়িয়ে মুক্তির যে জয়গান গেয়েছিলেন তাতে স্পেনের জালিম শাসক খড়-কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা স্পেনসহ ইউরোপের বিস্তৃত জমিনে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, অনন্তকালের অন্ধকার দূর করে আলোর মশাল প্রজ্জ্বলন করে।

কিন্তু ক্রুসেডের শিকার মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে অনৈক্য এবং ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাবার কারণে তারা শাসন ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ে। স্পেনের ক্ষমতা খ্রিস্টানরা দখল করে নেয়। মুসলমানদের উপর শুরু হয় নিধন অভিযান। একজন মুসলমানকেও স্পেনে রাখা হবে না- এই পণ নিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করে মুসলমানদের পৃথিবী থেকে বিদায় করতে থাকে। অল্প যে ক’জন পেরেছে তারা সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকায় আশ্রয় নিয়েছে। কিছু সংখ্যক মজলুমকে তখনকার তুর্কী খলিফা জাহাজের মাধ্যমে উদ্ধার করে তুরস্কে আশ্রয় দিয়েছে। যারা মুসলিম পরিচয় লুকিয়ে নিজের দেশ স্পেনে থাকার চেষ্টা করেছে তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং এক পর্যায়ে তাদেরকে চিহ্নিত করে হত্যা করা হয়েছে। ১৪৯২ সালে রীতিমতো আইন করে স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের মাধ্যমে স্পেন থেকে মুসলিম ও ইহুদিদের হয় বহিস্কার না হয় হত্যা করা হয়। এপ্রিল ফুলের মর্মান্তিক ঘটনা এ সময়ই ঘটানো হয়। স্পেনের রাজা ফার্নিন্দাজ এবং পর্তুগালের রাণী ইসাবেলার সম্মিলিত আক্রমণে এক পর্যায়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র স্পেন মুসলিমশূন্য হয়ে পড়ে।

আরাকানেও তাই হচ্ছে। সু চি এবং তার জেনারেলের সম্মিলিত আক্রমণে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমরা হয় হত্যা না হয় দেশান্তরের শিকার। আরাকান স্বাধীন ছিল। মিয়ানমার তাদের স্বাধীনতা হরণ করেছে। আরাকানের একমাত্র ভূমিপুত্র বা আদিবাসী বা স্থায়ী অধিবাসী রোহিঙ্গা মুসলিমরা। হাজার হাজার বছর ধরে তারা এ জনপদে বসবাস করছে। এটি তাদের জনপদ। এখানে অন্য কারোর নাক গলানোর কোন অধিকার নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার। একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে থাকতে দেয়া হবে না- এই পণ নিয়ে সু চি তার জেনারেলকে সাথে নিয়ে নিধন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। যে ক’জন মজলুম পারছে তারা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে। বাকীরা দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে।

বাংলাদেশ তার সীমিত সামর্থ্য দিয়ে দেশান্তরী রোহিঙ্গা মজলুমদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু এটি কোন সমাধান নয়। মূল সমাধান হল, সন্ত্রাসী রাষ্ট্র মিয়ানমারকে থামানো। বিশ্ব সংস্থাসমূহ আন্তরিকতার সাথে কাজটি করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

কিন্তু রোহিঙ্গারা মুসলিম হবার কারণেই আন্তর্জাতিক সুনজর তাদের দিকে ততটা নেই যতটা থাকা প্রয়োজন ছিল। অপরদিকে শতধাবিভক্ত মুসলিম উম্মাহও দায়িত্ব পালনে একেবারেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য কেউ কেউ যে এগিয়ে আসেনি তা কিন্তু  নয়। এক্ষেত্রে বর্তমান তুর্কী রাষ্ট্রপতির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। গত ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ কাজাকাস্তানের রাজধানী আস্তানায় অনুষ্ঠিত ওআইসির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্মেলনে বলেন, রোহিঙ্গা মুসলিম নিধনের বিষয়ে বিশ্বমুসলিমের নীরবতা অত্যন্ত লজ্জাজনক। রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে তিনি সকল মুসলিম রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি মজলুম রোহিঙ্গাদের জন্যে তাৎক্ষণিকভাবে ১০০০ টন খাদ্য সহায়তার কথা জানান।

রোহিঙ্গা সংকটের সময়টিতে তুরস্কেরই সাবেক এক রাষ্ট্রপতির কথা মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বায়েজিদ। উসমানী খেলাফতের প্রতিভু। গোটা মুসলিম দুনিয়ার সুখ-দুঃখে পাশে থাকেন। স্প্যানিশ ইনকুইজিশনের সময় ১৪৯২ সালে তিনি স্পেন থেকে বহিস্কৃতদের উসমানী সাম্রাজ্যে আনার জন্যে এডমিরাল কামাল রেইসের নেতৃত্বে জাহাজ পাঠান। উদ্বাস্তুদের তিনি তাঁর সাম্রাজ্যে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। তাদেরকে মর্যাদার সাথে স্বাগত জানানোর জন্যে তিনি সাম্রাজ্যজুড়ে ফরমান জারি করেন। তিনি সকলকে জানিয়ে দেন, উদ্বাস্তুতের কেবল আশ্রয় দিলেই হবে না; বরং তাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে হবে এবং তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করতে হবে। দক্ষ প্রজাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কার করায় রাজা ফার্দিনান্দকে ও ইসাবেলাকে উপহাস করে তিনি বলেন, ‘তোমরা ফার্দিনান্দকে জ্ঞানী শাসক বল, অথচ সে নিজের দেশকে দরিদ্র করে আমার দেশকে ধনী করেছে।’ দূরদর্শী এবং মানবিক সম্রাট বায়েজিদের এই অতিথি তথা আন্দালুসের মুসলিম ও ইহুদিরা উসমানী সাম্রাজ্যে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা, প্রক্রিয়া ও হস্তশিল্পের প্রচলন করে সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধ করেছিল। তারাই প্রথম ১৪৯৩ সালে কনস্টান্টিনোপলে ছাপখানা চালু করে।

১৪৯২ আর ২০১৭। ইতিহাস ঘুরে-ফিরে একই। মার খাচ্ছে মুসলিমরা। দেখার কেউ নেই, বলার কেউ নেই। নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের জন্যে এখন পর্যন্ত যেটুকু করা হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। ওআইসি এবং সৌদি আরবসহ প্রধান প্রধান মুসলিম সংস্থা ও রাষ্ট্রের নীরবতা সন্ত্রাসী মিয়ানমারকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
এখন প্রয়োজন একদিকে সকল সামর্থ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করা এবং অপরদিকে সন্ত্রাসী মিয়ানমারকে শায়েস্তা করা। আর এজন্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন মুসলমানদের মধ্যে অনৈক্য দূর করা এবং ইসলামের সঠিক অনুসরণ। হাজার বছরের নির্যাতিত নিপীড়িত মুসলিম জাতি-গোষ্ঠীর দুঃখ-বেদনায় ভারাক্রান্ত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন:

“খালেদ! খালেদ! ফজর হল যে, আজান দিতেছে কৌম্,
ঐ শোন শোন “আস্সালাতু খায়্র্্ মিনান্নৌম্!
যত সে জালিম রাজা বাদশারে মাটিতে করেছ গুম্
তাহাদেরি সেই খাকেতে খালেদ করিয়া তয়ম্মুম্
বাহিরিয়া এস, হে রণ-ইমাম, জমায়েত আজ ভারি!
আরব, ইরান, তুর্ক, কাবুল দাঁড়ায়েছে সারি সারি!
আব-জম্জম্ উথলি’ উঠিছে তোমার ওজুর তরে
সারা ইসলাম বিনা ইমামেতে আজিকে নামাজ পড়ে!”
(খালেদ: কাজী নজরুল ইসলাম)

২১ শে অগ্রহায়ণ, ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে কৃষ্ণনগরে অসুস্থ কবি খালেদ কবিতাটি রচনা করেছিলেন। দীর্ঘ ২৮২ চরণের এ কবিতার প্রতিটি চরণে ফুটে ওঠেছে এক দরদী অভিভাবকের দৃপ্ত উচ্চারণ। হাজার বছরের মজলুম জাতি মুসলমানদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্যে মহাবীর খালেদের মতো একজন রণ-ইমামের অনুপস্থিতি কবি অনুভব করেছেন অন্তরের গভীর থেকে। কবি গভীরভাবে লক্ষ্য করেছেন যে, মুসলমানদের পতনে কেবল মুসলমানদের ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে গোটা বিশ্বের, গোটা বিশ্বসভ্যতার। তাই বিশ্বকে কেবল রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযোগী হিসেবে নয়; বরং গোটা মানবজাতির বসবাসের উপযুক্ত রাখার স্বার্থেই আবার মুসলমানদের সামনে আসা জরুরি। আর এজন্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজেদের মধ্যে ঐক্য।
 
 
Copyright © , www.banglakothabd.com, All Rights Reserved.